দীপ্তি: একটি বেশব্লগ লিখেছে

আজকের প্রথম আলো ক্রোড়পত্র অধুনাতে পোস্ট পারটাম ব্লু নিয়ে একটা ফিচার করেছে l একটা নীল শাড়ি পড়া নারীকে মন খারাপ করে বসে থাকা ছবি দেখে এই বিষয়টি পড়তে আমি অতি আগ্রহী হলাম এবং পড়েই ফেললাম l সাথে গুগল ঘেটে এই বিষয়ে আরো কিছু বিষয় জানলাম এবং ব্যাপারটি একজন নারী হিসেবে মন থেকে উপলব্ধি করতে লাগলাম এবং কেস স্টাডির অংশ হিসেবে নিজেকেই এই নীল বেদনার শিকার ভেবে চমকে উঠালাম l নারীর এই নীল বেদনা আমি ভাবতেই কষ্ট পাচ্ছি আর যে নারীকে এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তার যে কি অবস্থ্যা তা বোধয় বিধাতাও আচ করতে গিয়ে বিমর্ষিত হোন l 
যাই হোক, লিখছি নীল বেদনার দায়ী ফ্যাক্টর "পোস্ট পারটাম ব্লু" নিয়ে l এই ডিজঅর্ডার সমন্ধে আমি মনে করি নারী-পুরুষ সকলেরই জানা উচিত, কারণ জানা থাকে নারী নিজেকে সামলে নিতে পারবেন আর পুরুষ তার স্ত্রীকে সামলাতে পারবেন ভালোবাসা দিয়ে l 
 
একটি মেয়ে জীবনের নানা বাঁকে নানা ধাপে নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতা পেরিয়ে চলে, তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলো এই মা হওয়ার অভিজ্ঞতা।  সন্তান জন্মের পর কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মায়ের হৃদয়টা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। তাই এর নাম ব্লু, যেন বেদনার নীল। এ সময় মেয়েরা খিটখিটে হয়ে ওঠে, বিষাদগ্রস্ত থাকে, মুড ওঠানামা করে, ঘুম ও রুচিতে হেরফের হয়, কখনো একা একা কাঁদে। 
 
‘পোস্ট পারটাম ব্লু’, নারীদের প্রসব পরবর্তিকালীন অর্থাৎ সন্তান হওয়ার পরের বিষাদগ্রস্ততা স্বাভাবিক একটা ঘটনা l বিশেষ করে প্রথম সন্তান হওয়ার পর একধরনের বিষণ্নতায় পেয়ে বসে বেশির ভাগ মাকে। এই বিষাদগ্রস্ততাকে বলে ‘পোস্ট পারটাম ব্লু’। স্বভাবতই, সন্তান হওয়ার পর মায়ের দৈনন্দিন রুটিন বদলে যায়। সন্তান গর্ভে আসার পর পৃথিবীতে সেই মায়ের যে কি সুখ, তা বোধয় একজন নারীই ভালো বোঝেন, অনাগত সন্তানকে ঘিরে তার থাকে কত না স্বপ্ন, কত না জল্পনা l প্রতিদিন যেন স্বপ্নের মত অতিবাহিত হয় প্রথম কিছু দিন, সন্তানের অপেক্ষা, অনাগত সন্তানের সাথে খুনসুটি, স্বামীর আর পরিবারের সকলের আনন্দ তাকলে ভুলিয়ে দেয় তার সকল প্রকার ব্যথা বেদনা l কিন্তু, স্বপ্নে বিভোর হয়েও যখন তার মানব শরীরে বাসা বাধে রাজ্যের সমস্যা, যখন আস্তে আস্তে অপেক্ষার প্রহর ঘনিয়ে আসে, তখনই বাধে বিপত্তি l মাথার ওপর বুক কাঁপানো অপারেশন থিয়েটারের তীব্র আলো, চিকিৎসকদের টুকটাক কথাবার্তা, একঝলক টুকটুকে এক পুতুলের মুখ, তারপর তীব্র ব্যথা, ব্যথানাশক ইনজেকশনের পর গভীর ঘুম, স্বপ্ন আর তন্দ্রার মধ্যে সিস্টারদের খোশ গল্পের আওয়াজ, ব্রেস্ট ফিডিংয়ে বারবার ভুল ও ব্যর্থতা, নবজাতকের জন্ডিস, ফটোথেরাপি, পুরো রাত কেবিনে শিশুর তীব্র কান্না আর চিৎকার। হসপিটালে এক সময় আর ভালো লাগে না, মনে হয় বাসায় ফিরে ভালো লাগবে কিন্তু বাসায় ফিরেও সেই মায়ের বিষাদ, মানসিক অবসাদ কিছুতেই চায় না যেতে, সে ভেসে যায় এক নীল বেদনায় আর এই টার্মিনোলজিই হলো 'পোস্ট পারটাম ব্লু', আসলে নারীটি তখন মনের অজান্তেই হীনমন্যতায় ভোগেন, নিজেকে সব থেকে বঞ্চিত ভাবেন, নিজেকে নিয়ে বেশি কনসার্ন থাকেন, তিনি ভাবেন যে, দিন নেই রাত নেই, সময় নেই অসময় নেই, জীবনটা এই শোবার ঘরে বন্দী হয়ে গেছে। তার জীবনে কেবল শিশুর কান্না, ওকে খাওয়ানো, কাঁথা-কাপড় পাল্টানো, গোসল করানো, সারা রাত জাগা, ঘুমচোখে আবারও জেগে থাকা, এমনকি ঠিকমতো খাওয়ারও সময় নেই, ফুরসত নেই একটা ভালো পোশাক পরার। আসলে এক ধরনের ক্ষোভ, যন্ত্রণা তাকে নীল কষ্ট দেয় l এক্ষেত্রে পরিবারের ভুমিকা অপরিসীম, সবার উচিত এ সময় মাকে বোঝার চেষ্টা করা। আকস্মিক হরমোনের ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করা হয় অনেক সময়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গর্ভধারণ, যথেষ্ট সামাজিক সহযোগিতা বা সমর্থন না থাকা, পরিবারে এ ধরনের সমস্যার ইতিহাস, নানা ধরনের সোশ্যাল স্টিগমাও একইভাবে দায়ী l  
 
ক্রমে নিজের ওপর বিতৃষ্ণা এসে যায়, মনে হয়, কাজ, অফিস, রোগীদের সঙ্গে নানা আলাপচারিতা, অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প-গুজব, স্বামীর সঙ্গে যখন-তখন ঘুরতে যাওয়া, শহরের নানা অনুষ্ঠান উৎসব —সবহলো হারিয়ে গেছে, যেন চিরকালের মতো।  গবেষকেরা বলছেন, ৮৫ শতাংশ নারীই এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। প্রথম সন্তানের বেলায় বেশি।  সন্তান প্রসবের পর কাছের মানুষদের সমবেদনা ও সহমর্মিতা, সন্তানকে সামলাতে সবার সার্বিক সহযোগিতা সমস্যাকে কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে অনেকটাই। তবে এসব সমস্যা যদি আট সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থেকে যায়, উপসর্গগুলো বাড়তে থাকে এমনকি কোনো নারী যদি আত্মহত্যা বা এ ধরনের গুরুতর কোনো কিছু চিন্তা করেন, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 
 
পুরুষদের বলছি, পোস্ট পারটাম ব্লু বা সন্তান প্রসবোত্তর বিষাদগ্রস্ততা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা, এ সময় মাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করুন, তার নানা অদ্ভুত আচরণ সহানুভূতির সঙ্গে মেনে নিন। তাকে এই কঠিন সময় উত্তরণে সহায়তা করুন।
মনে রাখবেন মা হবার অদম্য শক্তি যেহেতু আপনার আছে, তাই কোনো কিছুই আপনাকে থামাতে পারবে না। আপনি নির্ভয়ে, কোনো প্রকার জড়তা ছাড়াই এগিয়ে যান সামনের দিকে l জল, নদী, প্রকৃতি, আকাশ, প্রজাপতি, ফড়িং য়ের ডানা মেলে রেখেছে আপনার জন্য l রংধনুর আলোর বিচ্ছুরণের মতই আলোকের ঝরনাধারায় নিজেকে আর নিজের মনকে শুদ্ধ করে নিন l আর নীল সময়ের মধ্যে যদি পড়েই যান তবে নিজেকে বলতে হবে আপনি তো জয়িতা! এই চমৎকার অভিজ্ঞতাকে উপভোগ করুন। ভয় পাবেন না, এই পৃথিবী আপনারই আছে l 
*পোস্টপারটামব্লু* *নারীস্বাস্থ্য*

পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?


অথবা,

এক্ষনি একাউন্ট তৈরী কর

বেশতো সাইট টিতে কোনো কন্টেন্ট-এর জন্য বেশতো কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।

কনটেন্ট -এর পুরো দায় যে ব্যক্তি কন্টেন্ট লিখেছে তার।

...বিস্তারিত