সফলতার গল্প

সফলতারগল্প নিয়ে কি ভাবছো?

শপাহলিক: একটি বেশব্লগ লিখেছে

ঢাকা ভিত্তিক একটি অনলাইন ফ্যাশন হাউজ ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মেহেদী হাসান যিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ ও এমবিএ শেষ করেছেন। নর্থ সাউথ থেকে বিবিএ শেষ করার পর তিনি একটি কোম্পানিতে চাকরি করার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সান্ধকালীন এমবিএ শেষ করেছেন।

২০১৪ সালে অনলাইন ব্যবসা শহরে অপেক্ষাকৃত নতুন । কিন্তু হাসান বুঝতে পেরেছিলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক শিল্পই বেশ অগ্রসর হচ্ছে, সেদিক বিবেচনা করলে বাংলাদেশেও অনলাইন ব্যবসা দ্রুত গ্রো করবে। এই চিন্তা ভাবনা থেকেই তিনি এবং তাঁর দুই বন্ধু সহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লবিতে বসে ২০১৪ সালে একটি অফিসিয়াল ফেসবুক বিজনেস পেজ খোলার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ব্যবসা চালু করেন।

এর পরের, যাত্রা অবশ্য সহজ ছিল না। ব্যবসা শুরুর কয়েক মাস পর তার দুই অংশীদার ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন তিনি একটু চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাছাড়া তাঁর পরিবারও চাচ্ছিলেন না দেশের শীর্ষ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায়িক ডিগ্রী নেওয়ার পর তাদের সন্তান অনিশ্চিত কর্মজীবন চালিয়ে যাক। কিন্তু হাল ছাড়েননি মি. হাসান তিনি সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জগুলির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছেন। বর্তমানে তিনি-ফেসবুক, অফলাইন শপ ও দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শপিংমল আজকেরডিলের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে। 

দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শপিংমল আজকেরডিল ডটকম এধরনের নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উদ্দ্যোক্তাদের উঠে আসার গল্প তুলে ধরার চেষ্টা করছে। লক্ষ্য একটাই নতুন উদ্দ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা জোগানো। যার ধারাবাহিকতায় আজকের আয়োজন মিষ্টার হাসানের ‘ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল’ নিয়ে।

কনটেন্টটি স্পন্সরড করেছে আজকেরডিল.কম

 

মি. মেহেদী হাসান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ও একাউন্টিং বিভাগে পড়াশুনা করেছে। তিনি ২০১২ সালে বিবিএ শেষ করার পর, সন্ধ্যাকালীন কোর্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং এ এমবিএ করেন এসময় তিনি কোম্পানিতে জব করছিলেন।


প্রথম থেকেই নিতের মত করে কিছু একটা করার চেষ্টা তার মধ্যে ছিল। এর পরিকল্পিত রূপ হিসেবেই তার নেতৃত্বে ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল গড়ে ওঠে। ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল একটি অনলাইন ভিত্তিক শপিং বিজনেস। ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের লবিতে বসে তিনি এবং তার দুই বন্ধু মিলে ব্যবসার জন্য অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ তৈরি করেছিলেন। তার পর থেকে পথ চলা শুরু। যদিও কিছুদিন পর তার দুই বন্ধু ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু তিনি দমে যাননি, এই হাল ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়ে চলেন।


মি. মেহেদীর ব্যবসার ট্রেন্ড টা একটু ভিন্ন। তার মতে, যারা অনলাইন থেকে বেশিরভাগ পণ্য কেনা তারা যুবক সুতরাং তার টার্গেট অডিয়েন্স ইয়ং পিপল। এবং সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি পণ্য তৈরী করে আসছেন।


এই প্রজন্মের পথচলার শুরু থেকেই সঙ্গী হয়েছে ইন্টারনেট। মূলত ইন্টারনেটর দ্রুত অগ্রগতি অনলাইন ভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে মি. মেহেদী হাসানকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তিনি অনুধাবন করেছিলেন দ্রুতই মানুষ ইকমার্সে অভ্যস্থ হয়ে পড়বে কেউ আর মার্কেটে গিয়ে ঘাম ঝরিয়ে পণ্য কিনবে না তাই তিনি এই ধরনের ব্যবসা শুরু করার সিন্ধান্ত নেন। তার বাবার ঐতিহ্যবাহী বিটুবি বিজনেস ছিল সেখান থেকে তিনি অনুপ্রেরণা পান। তার অনুপ্রেরণার আরও একটি জায়গা আলিবাবা.কম। আলিবাবার সাইট দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এছাড়াও বিডিজবস এর সিইও জনাব ফাহিম মাশরুরের কিছু কথা ও উপদেশ তাকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল।

 

ব্যবসার শুরুর প্রথম দিকে তার তিন বন্ধু প্রত্যেকে ২০ হাজার টাকা করে কন্ট্রিবিশন করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে একজন রাজি না হওয়ায় দুজনে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। মি. হাসান প্রথমে কিছু গার্মেন্টস ও বাইং হাউসের সরবারহ কৃত এক্সপোর্ট কোয়ালিটির পোলো টিশার্ট ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিক্রি শুরু করেন। শুরু দিকে তারা মোবাইলে পণ্যের ছবি তুলে অনলাইনে আপলোড করতেন।

ফ্রেন্ডজ লাইফ স্টাইল মূলত পোশাক ও গহণা বিক্রি করে। তারা গ্রাহদের কাছে কোয়ালিটি পণ্য তুলে দেন। তাদের কালেকশনে প্যান্ট, সালোয়ার কামিজ, শাড়ি, গহনা, কূর্তী, টি-শার্ট ও পোলো শার্ট রয়েছে। ছেলে মেয়ে উভয়ের জন্যই তারা তাদের পণ্য সরবারহ করে। পণ্যের গুণগত মান ভালো হওয়ায় তার ব্যবসা দ্রুত অগ্রসরমান হচ্ছে। গত এক বছর ধরে তার ব্যবসার ক্রমর্বমান উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। ফ্রেন্ডস লাইফস্টাইলের কিছু রেগুলার কাস্টমার তৈরী হয়েছে যারা প্রতিনিয়ত পণ্য কিনে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ৫ জন টিম মেম্বার রয়েছ যারা প্রতিয়িত কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও তাদের পণ্য কাস্টমারদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য থার্ড-পার্টির ডেলিভারী সার্ভিসের সহায়তা নেন।

মি. মেহেদীর প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসা থেকে প্রতিবছর প্রায় কয়েক মিলিয়ন টাকা আয় করেন। অনলাইনের পাশাপাশি তারা অফলাইনেও তাদের পণ্য বিক্রি করেন। তাদের মোট বিক্রির ৬০% হয় অনলাইনে বাঁকি ৪০% হয় অফলাইনে।

 

মি. হাসানের অনলাইন এই ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লজিস্টিক সাপোর্ট। সারাদেশে দ্রুত পণ্য ডেলিভারী দেবার মত কোন ভালো ডেলিভারী সার্ভিস এখনো গড়ে ওঠেনি। কুরিয়ারের মাধ্যমে পণ্য ডেলিভারীতে বহু রকমের সমস্যা ফেস করতে হয়। সরকারি পোস্ট অফিস যদি এগিয়ে আসত তাহলে এই ব্যবসা দ্রুত অগ্রসর হবে এবং সব জায়গায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে তিনি মনে করেন।

দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শপিংমল আজকেরডিলের মাধ্যমে মি. হাসান ব্যবসা করছে। প্রায় ৪ বছর থেকে ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল আজকেরডিলের মার্চেন্ট হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। তাছাড়াও আজকেরডিলের সিইও জনাব ফাহিম মাশরুরের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বেশ ভাল। শুরু থেকে কিভাবে একটি ব্যবসা বড় করতে হয় সে পরামর্শ তিনি ফাহিম মাশরুরের কাছ থেকেই পেয়েছেন। আজকেরডিলের মাধ্যমে ফ্রেন্ডজ লাইফস্টাইল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০টির অধিক পণ্য বিক্রি করেন। তার মতে, পণ্য বিক্রির জন্য আজকেরডিল একটি বড় মাধ্যম।

নতুনদের জন্য মি. মেহেদী হাসানের পরামর্শঃ

প্রথমত, ব্যবসা শুরুর আগে সঠিক গবেষণা করুন, আপনার পণ্যের চাহিদা এবং বাজার বুঝে ব্যবসা শুর করা ভাল। সময় পরিবর্তিত হয়েছে, বাজার আরো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে, আগে আমরা মোবাইল ফটোগ্রাফি করে পণ্য বিক্রি করেছি কিন্তু এখন আর মোবাইল ফটোগ্রাফি অনলাইনে আপলোড করার মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না। এজন্য ভালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আপনার ব্যবসার জন্য সম্পূর্ণ সাপ্লাই চেইন সম্পর্কে জানুন এবং পরিকল্পনা করুন। আপনার পণ্য কোথায় থেকে আসবে কিভাবে ডেলিভারী দিবেন সেগুলো ঠিক করুন তারপর ব্যবসা শরু করুন। প্রতিশ্রুতি বজায় রাখার চেষ্টা করুন। কোন ক্রমেই যেন, কাস্টমাররা প্রতারিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। মনে রাখবেন, যখন একজন গ্রাহকের সাথে আপনার খারাপ অভিজ্ঞতা হবে, সাধারণত তখন সেই গ্রাহক আপনার কাছে দ্বিতীয়বার আসবেনা।

অবশেষে এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যবসার এবং জীবনে অনেক উত্থান পতন থাকবে। সংগ্রাম ও চেষ্টার মাধ্যমে কঠিন সময়গুলো পার করতে হবে। একটি টেকসই ব্যবসা দাঁড় করারনোর জন্য দীর্ঘ সময় লাগবে। আপনি যদি সত্যিই একটি ব্যবসা দাঁড় করাতে চান, তাহলে আত্মসমর্পণ করলে চলবে না, স্বপ্ন সত্যি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে এগিয়ে যেতে হবে।

*সফলতারগল্প* *স্পন্সরডকনটেন্ট* *আজকেরডিল* *স্মার্টশপিং* *ফ্রেন্ডজলাইফস্টাইল*

রবিন: একটি বেশব্লগ লিখেছে

আমার জন্ম জামালপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে। ১৪ কিলোমিটার দূরের শহরে যেতে হতো পায়ে হেঁটে বা সা ইকেলে চড়ে। পুরো গ্রামের মধ্যে একমাত্র মেট্রিক পাস ছিলেন আমার চাচা মফিজউদ্দিন। আমার বাবা একজন অতি দরিদ্র ভূমিহীনকৃষক। আমরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। কোনরকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো আমাদের।
আমার দাদার আর্থিক অবস্থা ছিলো মোটামুটি। কিন্তু তিনি আমার বাবাকে তাঁর বাড়িতে ঠাঁই দেননি। দাদার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেএকটা ছনের ঘরে আমরা এতগুলো ভাই-বোন আর বাবা-মা থাকতাম। মা তাঁর বাবার বাড়ি থেকে নানার সম্পত্তির সামান্য অংশপেয়েছিলেন। তাতে তিন বিঘা জমি কেনা হয়। চাষাবাদের জন্য অনুপযুক্ত ওই জমিতে বহু কষ্টে বাবা যা ফলাতেন, তাতে বছরে ৫/৬মাসের খাবার জুটতো। দারিদ্র্য কী জিনিস, তা আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি- খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই; কী এক অবস্থা !

আমার মা সামান্য লেখাপড়া জানতেন। তাঁর কাছেই আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি। তারপর বাড়ির পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হই।কিন্তু আমার পরিবারে এতটাই অভাব যে, আমি যখন তৃতীয় শ্রেণীতে উঠলাম, তখন আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলোনা। বড় ভাই আরো আগে স্কুল ছেড়ে কাজে ঢুকেছেন। আমাকেও লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারের পথে নামতে হলো।

আমাদের একটা গাভী আর কয়েকটা খাসি ছিল। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওগুলো মাঠে চরাতাম। বিকেল বেলা গাভীর দুধ নিয়েবাজারে গিয়ে বিক্রি করতাম। এভাবে দুই ভাই মিলে যা আয় করতাম, তাতে কোনরকমে দিন কাটছিল। কিছুদিন চলার পর দুধ বিক্রিরআয় থেকে সঞ্চিত আট টাকা দিয়ে আমি পান-বিড়ির দোকান দেই। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে বসতাম। পড়াশোনা তোবন্ধই, আদৌ করবো- সেই স্বপ্নও ছিল না !

এক বিকেলে বড় ভাই বললেন, আজ স্কুল মাঠে নাটক হবে। স্পষ্ট মনে আছে, তখন আমার গায়ে দেওয়ার মতো কোন জামা নেই। খালিগা আর লুঙ্গি পরে আমি ভাইয়ের সঙ্গে নাটক দেখতে চলেছি। স্কুলে পৌঁছে আমি তো বিস্ময়ে হতবাক ! চারদিকে এত আনন্দময় চমৎকারপরিবেশ ! আমার মনে হলো, আমিও তো আর সবার মতোই হতে পারতাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে আবার স্কুলে ফিরে আসতে হবে।
নাটক দেখে বাড়ি ফেরার পথে বড় ভাইকে বললাম, আমি কি আবার স্কুলে ফিরে আসতে পারি না ? আমার বলার ভঙ্গি বা করুণ চাহনিদেখেই হোক কিংবা অন্য কোন কারণেই হোক কথাটা ভাইয়ের মনে ধরলো। তিনি বললেন, ঠিক আছে কাল হেডস্যারের সঙ্গে আলাপকরবো।
পরদিন দুই ভাই আবার স্কুলে গেলাম। বড় ভাই আমাকে হেডস্যারের রুমের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ভিতরে গেলেন। আমি বাইরেদাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনছি, ভাই বলছেন আমাকে যেন বার্ষিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগটুকু দেওয়া হয়। কিন্তু হেডস্যার অবজ্ঞার ভঙ্গিতেবললেন, সবাইকে দিয়ে কি লেখাপড়া হয় ! স্যারের কথা শুনে আমার মাথা নিচু হয়ে গেল। যতখানি আশা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম,স্যারের এক কথাতেই সব ধুলিস্মাৎ হয়ে গেল। তবু বড় ভাই অনেক পীড়াপীড়ি করে আমার পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি যোগাড় করলেন।পরীক্ষার তখন আর মাত্র তিন মাস বাকি। বাড়ি ফিরে মাকে বললাম, আমাকে তিন মাসের ছুটি দিতে হবে। আমি আর এখানে থাকবোনা। কারণ ঘরে খাবার নেই, পরনে কাপড় নেই- আমার কোন বইও নেই, কিন্তু আমাকে পরীক্ষায় পাস করতে হবে।

মা বললেন, কোথায় যাবি ? বললাম, আমার এককালের সহপাঠী এবং এখন ক্লাসের ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাড়িতে যাবো। ওর মায়েরসঙ্গে আমার পরিচয় আছে। যে ক’দিন কথা বলেছি, তাতে করে খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে। আমার বিশ্বাস, আমাকে উনি ফিরিয়েদিতে পারবেন না।

দুরু দুরু মনে মোজাম্মেলের বাড়ি গেলাম। সবকিছু খুলে বলতেই খালাম্মা সানন্দে রাজি হলেন। আমার খাবার আর আশ্রয় জুটলো; শুরুহলো নতুন জীবন। নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম। প্রতিক্ষণেই হেডস্যারের সেই অবজ্ঞাসূচক কথা মনে পড়ে যায়, জেদ কাজ করেমনে; আরো ভালো করে পড়াশোনা করি।
যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলো। আমি এক-একটি পরীক্ষা শেষ করছি আর ক্রমেই যেন উজ্জীবিত হচ্ছি। আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাচ্ছে।ফল প্রকাশের দিন আমি স্কুলে গিয়ে প্রথম সারিতে বসলাম। হেডস্যার ফলাফল নিয়ে এলেন। আমি লক্ষ্য করলাম, পড়তে গিয়ে তিনিকেমন যেন দ্বিধান্বিত। আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তারপর ফল ঘোষণা করলেন। আমি প্রথম হয়েছি ! খবর শুনে বড় ভাইআনন্দে কেঁদে ফেললেন। শুধু আমি নির্বিকার- যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল।

বাড়ি ফেরার পথে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। আমি আর আমার ভাই গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছি। আর পিছনে এক দল ছেলেমেয়ে আমাকেনিয়ে হৈ চৈ করছে, স্লোগান দিচ্ছে। সারা গাঁয়ে সাড়া পড়ে গেল ! আমার নিরক্ষর বাবা, যাঁর কাছে ফার্স্ট আর লাস্ট একই কথা- তিনিওআনন্দে আত্মহারা; শুধু এইটুকু বুঝলেন যে, ছেলে বিশেষ কিছু একটা করেছে। যখন শুনলেন আমি ওপরের কাসে উঠেছি, নতুন বইলাগবে, পরদিনই ঘরের খাসিটা হাটে নিয়ে গিয়ে ১২ টাকায় বিক্রি করে দিলেন। তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে জামালপুর গেলেন।সেখানকার নবনূর লাইব্রেরি থেকে নতুন বই কিনলাম।

আমার জীবনযাত্রা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আমি রোজ স্কুলে যাই। অবসরে সংসারের কাজ করি। ইতোমধ্যে স্যারদের সুনজরে পড়েগেছি। ফয়েজ মৌলভী স্যার আমাকে তাঁর সন্তানের মতো দেখাশুনা করতে লাগলেন। সবার আদর, যত্ন, স্নেহে আমি ফার্স্ট হয়েই পঞ্চমশ্রেণীতে উঠলাম। এতদিনে গ্রামের একমাত্র মেট্রিক পাস মফিজউদ্দিন চাচা আমার খোঁজ নিলেন। তাঁর বাড়িতে আমার আশ্রয় জুটলো।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আমি দিঘপাইত জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হই। চাচা ওই স্কুলের শিক্ষক। অন্য শিক্ষকরাও আমার সংগ্রামের কথাজানতেন। তাই সবার বাড়তি আদর-ভালোবাসা পেতাম।
আমি যখন সপ্তম শ্রেণী পেরিয়ে অষ্টম শ্রেণীতে উঠবো, তখন চাচা একদিন কোত্থেকে যেন একটা বিজ্ঞাপন কেটে নিয়ে এসে আমাকেদেখালেন। ওইটা ছিল ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন। যথাসময়ে ফরম পুরণ করে পাঠালাম। এখানে বলা দরকার, আমার নাম ছিলআতাউর রহমান। কিন্তু ক্যাডেট কলেজের ভর্তি ফরমে স্কুলের হেডস্যার আমার নাম আতিউর রহমান লিখে চাচাকে বলেছিলেন, এইছেলে একদিন অনেক বড় কিছু হবে। দেশে অনেক আতাউর আছে। ওর নামটা একটু আলাদা হওয়া দরকার; তাই আতিউর করেদিলাম।

আমি রাত জেগে পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নিলাম। নির্ধারিত দিনে চাচার সঙ্গে পরীক্ষা দিতে রওনা হলাম। ওই আমার জীবনে প্রথমময়মনসিংহ যাওয়া। গিয়ে সবকিছু দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ ! এত এত ছেলের মধ্যে আমিই কেবল পায়জামা আর স্পঞ্জ পরে এসেছি !আমার মনে হলো, না আসাটাই ভালো ছিল। অহেতুক কষ্ট করলাম। যাই হোক পরীক্ষা দিলাম; ভাবলাম হবে না। কিন্তু দুই মাস পর চিঠিপেলাম, আমি নির্বাচিত হয়েছি। এখন চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে।

সবাই খুব খুশি; কেবল আমিই হতাশ। আমার একটা প্যান্ট নেই, যেটা পরে যাবো। শেষে স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসেরফুলপ্যান্টটা ধার করলাম। আর একটা শার্ট যোগাড় হলো। আমি আর চাচা অচেনা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। চাচা শিখিয়ে দিলেন,মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি যেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলি: ম্যা আই কাম ইন স্যার ? ঠিকমতোই বললাম। তবে এত উচ্চস্বরেবললাম যে, উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

পরীক্ষকদের একজন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডাব্লিউ. পিট আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সবকিছু আঁচ করেফেললেন। পরম স্নেহে তিনি আমাকে বসালেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমার খুব আপন হয়ে গেলেন। আমার মনে হলো, তিনি থাকলেআমার কোন ভয় নেই। পিট স্যার আমার লিখিত পরীক্ষার খাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর অন্য পরীক্ষকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কী-সব আলাপ করলেন। আমি সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পারলাম যে, আমাকে তাঁদের পছন্দ হয়েছে। তবে তাঁরা কিছুই বললেন না।পরদিন ঢাকা শহর ঘুরে দেখে বাড়ি ফিরে এলাম। যথারীতি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম। কারণ আমি ধরেই নিয়েছি, আমার চান্সহবে না।
হঠাৎ তিন মাস পর চিঠি এলো। আমি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি। মাসে ১৫০ টাকা বেতন লাগবে। এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি দেওয়াহবে, বাকি ৫০ টাকা আমার পরিবারকে যোগান দিতে হবে। চিঠি পড়ে মন ভেঙে গেল। যেখানে আমার পরিবারের তিনবেলা খাওয়ারনিশ্চয়তা নেই, আমি চাচার বাড়িতে মানুষ হচ্ছি, সেখানে প্রতিমাসে ৫০ টাকা বেতন যোগানোর কথা চিন্তাও করা যায় না !

এই যখন অবস্থা, তখন প্রথমবারের মতো আমার দাদা সরব হলেন। এত বছর পর নাতির (আমার) খোঁজ নিলেন। আমাকে অন্য চাচাদেরকাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা থাকতে নাতি আমার এত ভালো সুযোগ পেয়েও পড়তে পারবে না ? কিন্তু তাঁদের অবস্থাও খুব বেশিভালো ছিল না। তাঁরা বললেন, একবার না হয় ৫০ টাকা যোগাড় করে দেবো, কিন্তু প্রতি মাসে তো সম্ভব নয়। দাদাও বিষয়টা বুঝলেন।
আমি আর কোন আশার আলো দেখতে না পেয়ে সেই ফয়েজ মৌলভী স্যারের কাছে গেলাম। তিনি বললেন, আমি থাকতে কোন চিন্তাকরবে না। পরদিন আরো দুইজন সহকর্মী আর আমাকে নিয়ে তিনি হাটে গেলেন। সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরলেন।সবাইকে বিস্তারিত বলে সাহায্য চাইলেন। সবাই সাধ্য মতো আট আনা, চার আনা, এক টাকা, দুই টাকা দিলেন। সব মিলিয়ে ১৫০ টাকাহলো। আর চাচারা দিলেন ৫০ টাকা। এই সামান্য টাকা সম্বল করে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম। যাতায়াত খরচ বাদদিয়ে আমি ১৫০ টাকায় তিন মাসের বেতন পরিশোধ করলাম। শুরু হলো অন্য এক জীবন।

প্রথম দিনেই এম. ডাব্লিউ. পিট স্যার আমাকে দেখতে এলেন। আমি সবকিছু খুলে বললাম। আরো জানালাম যে, যেহেতু আমার আরবেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই তিন মাস পর ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হবে। সব শুনে স্যার আমার বিষয়টা বোর্ড মিটিঙেতুললেন এবং পুরো ১৫০ টাকাই বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। সেই থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এস.এস.সি পরীক্ষায়ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলাম এবং আরো অনেক সাফল্যের মুকুট যোগ হলো।
আমার জীবনটা সাধারণ মানুষের অনুদানে ভরপুর। পরবর্তীকালে আমি আমার এলাকায় স্কুল করেছি, কলেজ করেছি। যখন যাকে যতটাপারি, সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতাও করি। কিন্তু সেই যে হাট থেকে তোলা ১৫০ টাকা; সেই ঋণ আজও শোধ হয়নি। আমার সমগ্রজীবন উৎসর্গ করলেও সেই ঋণ শোধ হবে না!

(অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমানের নিজের ভাষায় তাঁর জীবন কথা)

*সফলতারগল্প* *সফল* *সফলতা*

বেশতো সাইট টিতে কোনো কন্টেন্ট-এর জন্য বেশতো কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।

কনটেন্ট -এর পুরো দায় যে ব্যক্তি কন্টেন্ট লিখেছে তার।

...বিস্তারিত

QA

★ ঘুরে আসুন প্রশ্নোত্তরের দুনিয়ায় ★