সাহিত্য

সাহিত্য নিয়ে কি ভাবছো?

আমানুল্লাহ সরকার: একটি নতুন প্রশ্ন করেছে

 সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ ২০১৮ কে পেয়েছেন?

উত্তর দাও (১ টি উত্তর আছে )

*সাহিত্য* *নোবেলপ্রাইজ*

আলোহীন ল্যাম্পপোস্ট: একটি বেশব্লগ লিখেছে

১৩ নভেম্বর ২০১৭ বাংলা সাহিত্যের নক্ষত্রপুরুষ হুমায়ূন আহমেদের ৬৯তম জন্মদিন। বেঁচে থাকলে তিনি আজ ৬৯তম বর্ষে পা দিতেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তাঁকে চলে যেতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কি সত্যিই চলে গেছেন? না, চলে যান নি। তিনি তাঁর লেখার মাধ্যমে আমাদের মাঝে জীবিত আছেন। অবশ্য এই লেখার মাধ্যমে বেঁচে থাকা নিয়ে তাঁর মনোভাব ভিন্ন ছিলো। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আমি মারা গেলে আমার লেখা মানুষ পড়লো কি পড়লো না তা দিয়ে আমার কী যাবে আসবে? আমিই তো নেই!

হুমায়ূন আহমেদ রসিক মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর এই মন্তব্যকে আমরা তাঁর রসিকতা হিসেবে ধরে নিতে পারি। কিন্তু এই কথাকে রসিকতা মনে করলেও এর ভেতর যে কঠিন বাস্তবতা আছে তাকে অস্বীকার করতে পারি না। লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ নিঃসন্দেহে উপকৃত হচ্ছে কিন্তু তা দিয়ে ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের সত্যিই কিছু যাচ্ছে আসছে কিনা তা চিন্তার দাবি রাখে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন, তাঁর লেখায় ধর্মের কোনো উপকার হয়নি, কাজেই মৃত্যুর পর তাঁর এই লেখা তাঁর কোনো কাজে আসছে না। আমি এই কথার সঙ্গে দুইটি কারণে একমত না। প্রথম কারণ হচ্ছে, কোনো শিল্পকেই ধর্ম দিয়ে বিচার করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদ তাঁর লেখার মাধ্যমে ব্যাপাকভাবে ধর্মপ্রচার না করলেও তাঁর লেখা পড়ে লাখ লাখ পাঠক মনের খোরাক পেয়েছেন। অসংখ্য মানুষ তাঁর লেখা পড়ে ব্যক্তিজীবনেও উপকৃত হয়েছেন এবং অনেক মানুষ তাঁর লেখা পড়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা পেয়েছেন। এক কথায় তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে মানবতার কথা প্রচার করেছেন। কাজেই আমার বিশ্বাস, পরকাল বলে কিছু থাকলে নিশ্চয়ই তিনি এর জন্যে পুরস্কৃত হয়েছেন।

আরেকটা কথা এখানে বলে রাখি। আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণার প্রচলন হচ্ছে, আমরা মনে করি ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব ঈশ্বর মওলানাদেরকে দিয়েছেন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ধর্ম অনেক বড় ব্যাপার। এতোই বড় ব্যাপার যে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কোনো মানুষের পক্ষে নেওয়া সম্ভব না। একমাত্র ঈশ্বরই তার রক্ষাকারী হতে পারেন। মওলানাদের সংকীর্ণ চিন্তা দিয়ে আর কিছু হোক বা না হোক— বিভ্রান্তি বাড়ে। মওলানাদের সংকীর্ণ চিন্তা দিয়ে বিভ্রান্তি বাড়ে তা এইজন্যে বললাম যে, তারা মনে করে ঈশ্বর তাদেরকে ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। অথচ এর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ইসলাম ধর্ম হচ্ছে ঈশ্বরের প্রেরিত বিধান। একজন সামান্য সৃষ্টি তার মহান স্রষ্টার বিধানকে পালন করতে পারে কিন্তু তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব বা যোগ্যতা তার নেই। তাছাড়া ঈশ্বর নিজেই পবিত্র কুরানে বলেছেন, ‘ইন্না নাহনু নাযযালনায যিকরা ওয়া ইন্না লাহু লা হাফিযুন। অর্থাৎ আমিই ইসলাম ধর্মকে অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এই ধর্মের রক্ষাকারী।’ ঈশ্বর নিজে যেখানে ঘোষণা করেছেন যে তিনি ইসলাম ধর্মের রক্ষাকারী সেখানে মওলানারা এই ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেওয়ার কে? এই দায়িত্বই বা কে তাদেরকে দিলো?

এই কথাগুলো তেমনভাবে প্রাসঙ্গিক না হলেও বলার প্রয়োজন ছিলো তাই বললাম। এবার প্রিয় কথাসাহিত্যিকের প্রসঙ্গে আসি। আমার জীবনে হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব অনেক বেশি। অবশ্য আমাদের বয়সের পাঠক যারা আছেন তাদের সবার জীবনেই হুমায়ূন আহমদের প্রভাব অনেক বেশি। কারণ, আমরা হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েই বইপড়া শিখেছি। হুমায়ূন আহমেদের যুগ শুরু হওয়ার আগের সময়টায় বাংলাদেশের পাঠকসমাজে কলকাতার লেখকদের প্রভাব অনেক বেশি ছিলো। আর পাঠকদের একটা বড় অংশ তখন ফুটপাতের সস্তা লেখকদের দিকে ঝুঁকে গিয়েছিলো। হুমায়ূন আহমেদ এসে ইতিহাস বদলে দিলেন। তাঁর লেখনীর টানে পাঠকসমাজ আবার মৌলিক সাহিত্যের দিকে ফিরে আসলো। শুধু সাহিত্যের ইতিহাস নয়, তিনি আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসও বদলে দিলেন। সিনেমা হল বিমুখ দর্শকরা আবার সিনেমা হল মুখী হলো। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মতো মানসম্মত চলচ্চিত্র এখনো খুব একটা তৈরি হয় নি।

সাড়ে পাঁচ বছর আগে হুমায়ূন আহমেদ প্রয়াত হয়েছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের পরেও একুশের বইমেলায় হুমায়ূন-শূন্যতা এখনো প্রকট হয়ে ওঠে। একজন লেখক হিসেবে এটা হুমায়ূনের জন্যে অনেক বড় পাওয়া। বাংলা ভাষার লেখক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আজ পর্যন্ত যতোটা উচ্ছ্বাস পাঠকসমাজের মধ্যে দেখা গেছে তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। নাট্যকার হিসেবে দর্শকদের তিনি যতোটা নাড়া দিয়েছেন তার নজির কোথাও নেই। নন্দিত নরকে থেকে দেয়াল পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি বই বিক্রির দিক থেকে রেকর্ড সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। কলকাতায় কোনো লেখকের বই বিশ হাজার কপি বিক্রি হলে যথেষ্ট মনে করা হয়। অথচ বাংলাদেশে তাঁর বই বিক্রি হয়েছে প্রায় কয়েক লাখ কপি।

হুমায়ূন আহমেদের লেখার প্রধান গুণ হচ্ছে তিনি সরল ভাষায় লিখেন। সরল সংলাপের কারণে মনে হয় গল্পের চরিত্ররা সামনে বসে কথা বলছে। আগে একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে অসংখ্যবার অভিধান খুলতে হতো। অথচ হুমায়ূনের লেখা পড়তে গেলে অভিধান কোলে নিয়ে বসতে হয় না। তাঁর লেখায় দুর্বোধ্য বৈচিত্র্য নেই আবার গল্পের গভীরতাও কম নয়। প্রতিটি বই পড়ার সময় পাঠক উপলব্ধি করে গল্পের কোনো জাদুকর যেন তার সামনে বসে গল্প করছে। একই বই কয়েকবার পড়ার পরেও মনের আশ মিটে না। অদ্ভুত এক জাদুময় ভাষার কারণে বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। নিজের কাছে নিজের যে দূরত্ব এবং একাকীত্ব তা অনেকাংশে ঘুচে যায়। আমার মতে, হুমায়ূনের জনপ্রিয়তার কারণ শুধু তাঁর সাবলীল গদ্যভঙ্গিই না, সাবলীল গদ্যভঙ্গিতে খুবই দক্ষতার সঙ্গে তিনি জীবনের যেই গল্প বলতেন সেটাই সবচেয়ে বড় কারণ। হুমায়ূনের প্রতিটি গল্প পড়লে মনে হয় পৃথিবীর কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই এই ঘটনা ঘটেছে। হুমায়ূনের মতে, লেখককে সত্যের মতো করে মিথ্যা বলতে জানতে হয়। তিনি তাঁর কাল্পনিক গল্পগুলি সত্যের মতো করে লিখেছেন। এখানেই তিনি সার্বজনীন এবং সফল। এই বোধ তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে গেছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, হুমায়ূনের এই সাফল্য এবং জনপ্রিয়তায় বড় বড় অনেক লেখক আহত হলেন। আমরা যেটা পারিনি হুমায়ূন আহমেদ কেন সেটা পারলেন এই পীড়া তাঁরা প্রকাশ করলেন না কিন্তু হুমায়ূনকে সাহিত্যসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। বললেন, হুমায়ূন আহমেদ সস্তা শ্রেণির লেখক। এই কথা বলে তাঁরা কিন্তু সাহিত্য এবং শিল্প সম্পর্কে নিজেদের অদূরদর্শিতা এবং অপরিণত ধারণার কথাই প্রকাশ করলেন। সাহিত্য এবং ভাষা যে নদীর স্রোতের মতো পরিবর্তনশীল এটা তাঁরা পরোক্ষভাবে অস্বীকার করলেন। কথাসাহিত্যিক, গবেষক এবং কবি হুমায়ূন আজাদ বললেন, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসিকই না— তিনি অপন্যাসিক। কিছুদিন পরে তিনি হুমায়ূন আহমেদ এবং ইমদাদুল হক মিলনকে একটা বই উৎসর্গ করলেন। উৎসর্গপত্রে লিখলেন, সব নষ্টদের অধিকারে গেলো। হুমায়ূন আজাদ অনেক বড়মাপের মানুষ। আমি তাঁকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করি। কিন্তু তাঁর এহেন মন্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারি না। তিনি হুমায়ূনকে চিনতে ভুল করেছেন।

হুমায়ূন আহমেদ আসলে কী এবং তিনি আমদেরকে কী দিয়েছেন? হুমায়ূন আহমেদ সেই শ্রেণির লেখক যাঁরা কয়েক শতাব্দীর সাধনায় জন্ম নেন এবং কয়েক শতাব্দীকাল ধরে চলে আসা একঘেঁয়ে গদ্যরীতি ভেঙ্গে সহজবোধ্য নতুনত্বের জন্ম দেন। সাহিত্যকে নতুন এবং আধুনিক করার মাধ্যমে আরো মর্মস্পর্শী করে তোলেন। আমাদের অনেক শ্রদ্ধাভাজন লেখকই হুমায়ূনকে এভাবে বিচার করতে পারেন নি। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর সৈয়দ শামসুল হক বললেন, হুমায়ূনের লেখা ছোটগল্প কালজয়ী হলেও উপন্যাস তা নয়। তিনি ভুলে গেলেন, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসের মাধ্যমেই পাঠকদের মনোজয় করেছেন। যে লেখা বাধাহীনভাবে পাঠকের হৃদয় জয় করে সেই লেখা যদি কালজয়ী না হয় তাহলে আর কোন লেখা কালজয়ী? একবার তিনি হুমায়ূনকে বললেন, আপনি সাহিত্যের মানুষ, টিভিতে নাটক লিখে প্রতিভা নষ্ট করছেন কেন? হুমায়ূন আহমেদ তার উত্তরে এক লেখায় বললেন, সৈয়দ হক মঞ্চনাটক লিখেন। মঞ্চনাটক লিখলে সাহিত্য হয় আর টিভি নাটক লিখলে সাহিত্য হয় না এই অদ্ভুত ধারণা তিনি কোথায় পেলেন আমি জানি না। মঞ্চনাটক হোক, টিভিনাটক হোক কিংবা কোনো ফিল্মের গল্প হোক, সাহিত্যের বিচরণক্ষেত্র সর্বত্রই অবাধ। সাহিত্য সাহিত্যই। সেটা যেখানেই করা হোক এবং যেভাবেই করা হোক। শিল্প-সাহিত্যের নীল আকাশের নিচে কোনো সীমানা নেই। অনেকেই বলেন, হুমায়ূন আহমেদ এন্টারট্রেইনার লেখক ছিলেন। তারা ভুলে যান, হুমায়ূন আহমেদ প্রবীণ এবং তরুণ প্রজন্মকে একইসঙ্গে আনন্দ দিয়েছেন। এটা মোটেই সহজ কাজ না। যে লেখক একইসঙ্গে এই দুই প্রজন্মকে হাসাতে পারেন, কাঁদাতে পারেন এবং সর্বোপরি নিজের লেখায় মজাতে পারেন তিনি সত্যিকার অর্থেই বড়মাপের লেখক। তাছাড়া একজন লেখকের কাল্পনিক চরিত্র পড়ে পাঠকসমাজ সেই চরিত্র বাস্তব জীবনে ধারণ করে, এমন অসম্ভব ক্ষমতাধর লেখক বিশ্বসাহিত্যে বিরল। হুমায়ূন আহমেদ নিঃসন্দেহে সেই পর্যায়ের অসম্ভব ক্ষমতাধর এবং বিরল লেখক। সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের দেশের অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখাও আমাকে কষ্ট করে পড়তে হয়। তাঁদের লেখায় আর যাই থাক, গতিময়তা নেই, যেটা হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই গতিময়তার অভাবে আমি তাঁদের অনেক বিখ্যাত লেখাই পড়ি নি। শিল্প জিনিসটা দুর্বোধ্য হলে চলে না। শিল্প যখন সাবলীল এবং গতিময় হয় তখন তা কালোত্তীর্ণ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের যুগে বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন গুরু পর্যায়ের লেখক। তাঁর গদ্যভঙ্গি অত্যন্ত জটিল ছিলো। সেইযুগে রবীন্দ্রনাথ যে ভঙ্গিতে লিখেছেন তা এক কথায় সরল এবং সাবলীল গদ্য। ফলে রবীন্দ্রনাথ জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে গেলেন। আজ পর্যন্ত বাংলাসাহিত্য তাঁকে অসীম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে এবং গুরু বলে স্বীকার করে। অবশ্য সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গদ্যভাষাও এখন কিছুটা কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো তাঁর আবেদন কোনো অংশেই কমে নি। হুমায়ূনও তাই করেছেন। কলকাতার দুর্বোধ্য ভাষা থেকে তিনি আমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। লেখা হতে হবে এমন যেটা সমাজের উচ্চশ্রেণী থেকে নিম্নশ্রেণী পর্যন্ত সবাই অভিধান হাতে না নিয়ে পড়তে পারে এবং খুব সহজে বুঝতে পারে। যে লেখা পড়তে গিয়ে বারবার অভিধান হাতে নিতে হয় সেই লেখা সাহিত্য হলেও মহৎ এবং কালজয়ী সাহিত্য না। আবার যে লেখা পড়তে বসে অভিধান হাতে নিতে হয় না কিন্তু কিছু বোঝাও যায় না সেই লেখা সাহিত্যের কোনো পর্যায়েই পড়ে না। দুর্বোধ্যতা তৈরি করাও এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা। রবীন্দ্রনাথ সবসময় সহজ করে লেখার পক্ষে ছিলেন। সহজ করে লেখা কিন্তু মোটেও সহজ নয়। বরং এটা জটিল করে লেখার চেয়েও অনেক কঠিন কাজ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, সহজ করে লিখতে আমায় কহ যে/সহজ করে যায় না লেখা সহজে। হুমায়ূনকে অনেক রথী-মহারথী লেখক চিনতে পারেন নি তার কারণ, তিনি চেয়েছেন বাংলা সাহিত্য আরো সাবলীল, সহজবোধ্য এবং মর্মস্পর্শী হোক। এজন্যে অনেকেই তাঁকে সস্তাশ্রেণির লেখক আখ্যা দিয়েছেন। আবার অনেক দূরদর্শী এবং বড়মাপের লেখক তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছেন। হুমায়ূনকে তারা চিনতে পেরেছেন এবং হিরেকে তাঁরা কাঁচ ভেবে ভুল করেন নি। সময়ই তা বলে দিয়েছে। স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান বলেছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সস্তা চতুর্থশ্রেণির লেখকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এ কথা বলতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই যে, তিনি আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে কিংবদন্তির মর্যাদা পাবেন’। প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘হুমায়ূনের লেখা অনেক সাবলীল। বাংলা ভাষাটার আদ্যোপান্ত জানা না থাকলে এতোটা সাবলীল করে লেখা যায় না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে হুমায়ূন শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন।’

সাহিত্যে দুর্বোধ্যতার কারণে পাঠকসমাজ সাহিত্যবিমুখ হতে চলেছিলো। হুমায়ূন আহমেদ একক প্রচেষ্টায় তাদেরকে ফিরিয়ে এনেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনি সহজের পথে চলেছেন। হুমায়ূনের ভাষায় তাঁর লেখা হচ্ছে ‘সহজিয়া ধাঁচের’ লেখা। তিনি লিখেছেন, দেখেছেন, দেখিয়েছেন, আপ্লুত করেছেন, সবাইকে জয় করেছেন এবং সর্বোপরি বাংলাসাহিত্যের রাজমুকুটটি নিজের যোগ্যতায় অর্জন করেছেন। তিনি আমাদের হুমায়ূন আহমেদ এবং আমরা তাঁর পাঠকসমাজ। এমন একদিন আসবে যেদিন আমরা গর্ব করে বলবো, আমরা হুমায়ূন আহমেদের যুগের পাঠক এবং আমরা তাঁকে দেখেছি। সেইদিন প্রায় সমাগত।

( কপি পেষ্ট )

*হুমায়নআহমেদ* *সাহিত্য* *জন্মদিন*

খুশি: একটি নতুন প্রশ্ন করেছে

 ঘনরাম চক্রবর্তী কে ছিলেন?

উত্তর দাও (১ টি উত্তর আছে )

*কবি* *বাংলাসাহিত্য* *সাহিত্য* *ঘনরাম*

ইমরান নাজির লিপু: একটি নতুন প্রশ্ন করেছে

 সত্তরের দশকের কবি দাউদ হায়দার সম্পর্কে তথ্য জানতে চাই।

উত্তর দাও (৩ টি উত্তর আছে )

.
*দাউদ-হায়দার* *কবি* *সাহিত্য*

নিরাপদ নিউজ: সেলিনা জাহান প্রিয়ার ছোট গল্প: ‘​বৃষ্টির কদম ফুল ও নয়ন’ ১৯৮৩ সাল খুব বৃষ্টি সকাল থেকে কিন্তু তার স্কুলে যেতে হবে কারন সামনে ফাইনাল অংক আর ইংলিশ মিস করা যাবে না । তারা তিন বোন এক ভাই । দুই বোনের বিয়ে... বিস্তারিত পড়ুন- http://www.nirapadnews.com/2016/02/25/news-id:133401/

*ছোটগল্প* *আড্ডা* *সেলিনাজাহান* *সাহিত্য*

বিডি আইডল: একটি নতুন প্রশ্ন করেছে

 বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখা উপন্যাস, প্রবন্ধ ও গল্পগুলো লেখকের নামসহ জানতে ইচ্ছুক ?

উত্তর দাও (৩ টি উত্তর আছে )

.
*মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক* *উপন্যাস* *প্রবন্ধ* *গল্প* *সাহিত্য*

শ্যামল মিত্র: একটি নতুন প্রশ্ন করেছে

 ঔপন্যাসিক হরিশংকর জলদাস ও তার রচিত সাহিত্য সম্পর্কে জানতে চাই ।

উত্তর দাও (২ টি উত্তর আছে )

.
*হরিশংকর-জলদাস* *সাহিত্য* *উপন্যাস*

বিম্ববতী: একটি বেশব্লগ লিখেছে

জন কিটস, বিশ্বসাহিত্যের রূপকথার রাজপুত্র যিনি লিখেছিলেন -

“Beauti is truth, truth beauty,” that is all
Ye know on earth, and all ye need to know."
যার অর্থ দাঁড়ায়- 
‘সুন্দর সত্য, সত্যই সুন্দর, এটিই সব
তুমি জানো এবং তোমাদের সবারই জানা উচিত।’

আজকে তাঁর জীবন বা কবিতা নয়, চির সৌন্দর্যের এই কবির একটা পরিত্যক্ত মহাকাব্য নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে- কারণ তাঁর এই পরিত্যক্ত মহাকাব্যটি মিথ নিয়ে লেখা। আমার ভীষণ ব্যক্তিগত আগ্রহ ও কৌতহলের জায়গা হলো মিথ ! উপকথা বা মিথ এর একটি গ্রহনযোগ্য সংজ্ঞা হল: 

"A traditional story about heroes or supernatural beings, often attempting to explain the origins of natural phenomena or aspects of human behavior."
- বাক্যটির দ্বিতীয় অংশটিই গুরুত্বপূর্ন। মিথ মানুষের আচরণের ভিত্তিকে ব্যাখ্যা করতে চায়, এ কারণেই মিথ-এর প্রতি আমার এত আগ্রহ।এই একই কারণে রুপকথাও এত ভালবাসি,,,(বৃষ্টি),,

সে যা ই হোক "হাইপেরিয়ন" ইংরেজিতে "Hyperion", জন কিটস'র লেখা এই মহাকাব্যটি পরিত্যক্ত কারণ ১৮১৮ সালের শেষ ভাগ থেকে ১৮১৯ সালের বসন্তের মাঝে কিটস এই কবিতাটি লিখেছিলেন। কিন্তু তারপর এই কবিতার মধ্যে "অতিরিক্ত মিলটন-সুলভ স্তর" দেখে লেখা বন্ধ করে দেন তিনি। পরে দ্য ফল অফ হাইপেরিয়ন: এ ড্রিম কবিতায় কিটস আবার এই কবিতার বিষয়বস্তু গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি সত্য অনুসন্ধান ও উপলব্ধির এক ব্যক্তিগত অভিযানের আদলে মহাকাব্যটি পুনরায় লেখার চেষ্টা করেছিলেন। কবিতার বিষয় বস্তুটাই হলো মিথ নিয়ে যেখানে গ্রিক পুরাণের টাইটান ও অলিম্পিয়ান দেবতাদের মধ্যে সংঘর্ষ ও অলিম্পিয়ানদের হাতে টাইটানদের পরাজয়ের বর্ণনা পাওয়া যায়। অলিম্পিয়ানদের উত্থানের আগে টাইটান নামে এক দেবমণ্ডলী (প্যানথেয়ন) রাজত্ব করতেন।  এখন এই টাইটানদের পতন আসন্ন। টাইটানদের মধ্যে ছিলেন স্যাটার্ন (দেবতাদের রাজা), ওপস (তাঁর স্ত্রী), থিয়া (স্যাটার্নের বোন), এনকেল্যাডাস (যুদ্ধের দেবতা), ওশেনাস (সমুদ্রের দেবতা), হাইপেরিয়ন (সূর্যের দেবতা) ও ক্লিমেন (এক তরুণী দেবী)। কবিতার শুরুতে দেখা যায়, জুপিটারের হাতে পরাজিত হয়ে স্যাটার্ন ক্ষমতা হারানোর দুঃখে বিলাপ করছেন। থিয়া তাঁকে নিয়ে যাচ্ছেন সেইখানে যেখানে অন্যান্য টাইটানরা বসে আছেন। তাঁরাও সবাই দুঃখে কাতর। তাঁরা আলোচনা করছেন নতুন দেবতাদের (অলিম্পিয়ান) বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা যায় কিনা তা নিয়ে। ওশেনাস বলছেন, তিনি নেপচুনের (নতুন সমুদ্র দেবতা) হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে চান, কারণ নেপচুন খুবই সুদর্শন (এখানে মনে রাখতে হবে, রোম্যান্টিক ধ্যানধারণায় সৌন্দর্যকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত)। ক্লিমেন অ্যাপোলোর গানের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই গান বেদনাময় সুন্দর (আরেক রোম্যান্টিক ধারণা)। শেষে এনকেল্যাডাস একটি বক্তৃতা দিয়ে টাইটানদের যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। এদিকে হাইপেরিয়নের বর্ণনার সময় আমরা দেখতে পাই, তিনিই একমাত্র টাইটান যিনি তখনও ক্ষমতাবান রয়েছেন। ইউরেনাস (আকাশের দেবতা, স্যাটার্নের পিতা) তাঁকে সম্বোধন করে স্যাটার্ন ও অন্যান্য টাইটানদের কাছে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। হাইপেরিয়নের আবির্ভাবের পর কবিতায় টাইটানদের বর্ণনা শেষ হয়। অ্যাপোলোর (সংগীত, সভ্যতা ও সংস্কৃতির নতুন দেবতা) বর্ণনা শুরু হয়। অ্যাপোলো সৈকতে বসে কাঁদছিলেন। এখানে নেমোসিনের (স্মৃতিশক্তির দেবী) তাঁর দেখা হয় এবং অ্যাপোলো তাঁর কাছে নিজের কান্নার কারণ ব্যাখ্যা করেন: তিনি তাঁর দৈবশক্তির আভাস পাচ্ছেন, কিন্তু তা পূর্ণ করে তুলতে পারছেন না। নেমোসিনের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন এবং পূর্ণ দেবতায় পরিণত হন। এইখানে একটি পংক্তির মাঝপথে "celestial" (স্বর্গীয়) শব্দটির উল্লেখের পর কবিতাটি অসমাপ্ত রয়ে গেছে।(জন কিটস'র হাতের লেখাটা কি ভীষণ সুন্দর !)

হাইপেরিয়ন কবিতায় কিটসের অমিত্রাক্ষর ছন্দ (মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যে যা প্রবর্তন করেন) নতুন মাত্রা পেয়েছে। থিয়া ও পরাজিত স্যাটার্নকে নিয়ে লেখা উদ্বোধনী পংক্তিগুলি এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য: 

উপত্যকার অন্ধকার দুঃখের গভীরে
প্রভাতের সুবাতাস থেকে বহু দূরে
অগ্নিময় দ্বিপ্রহর থেকে বহু দূরে, সন্ধ্যাতারার থেকেও দূরে,
বসে আছেন পক্ককেশ স্যাটার্ন তাঁর আস্তানায়,
পাষাণের ন্যায় স্তব্ধ, নৈঃশব্দের মতো নিশ্চুপ,,,,,(মেঘ),,,,,
(অনুবাদ)

ছন্দ ও শৈলীর দিক থেকে এই কবিতাটি অনেকটাই জন মিলটনের কবিতার সঙ্গে তুলনীয়। যদিও তাঁর চরিত্রগুলি একটু আলাদা। অ্যাপোলো অনেকটা প্যারাডাইস লস্ট -এর পুত্র বা প্যারাডাইস রিগেইনড কাব্যের যিশুর মতো হলেও, হাইপেরিয়নের সঙ্গে স্যাটানের তুলনা করা চলে না। তাছাড়া এখানে চরিত্রগুলির ভূমিকাও অন্যরকম। অ্যাপোলো সিংহাসনের দাবিদার। তাঁর জয় হচ্ছে। তিনি আরও “সত্য” হচ্ছেন, আর তাই আরও “সুন্দর” হচ্ছেন।


কৃতজ্ঞতা ও তথ্যসূত্র:
https://bn.wikipedia.org/wiki/হাইপেরিয়ন_(কবিতা)
http://www.somewhereinblog.net/blog/benqt60/২৯২৬৪৫০২
http://www.bl.uk/works/hyperion
*কবি* *জন-কিটস* *সাহিত্য* *মিথ* *কবিতা*

বিম্ববতী: একটি বেশব্লগ লিখেছে

মুখ ও মুখোশ শীর্ষক এ আলোচনার পরিসর বিস্তৃত। তাই এ বিষয়টি আলোচনার সূচনা করা হোক আমাদের আপন সমাজ থেকেই। উনিশ শতকের বাবু সংস্কৃতি থেকে হালফিলের বাঙালি সমাজ। এ সমাজের মুখোশের প্রতি আনুগত্য সীমাহীন। যে মুখোশকে ছিঁড়তে আমার ফ্যাতাড়ুরা ঘুরে বেড়ায় এ শহর, এ রাজ্যের গোটা আকাশে।

কী লিখি, কেন লিখি?
যেকোনো সাহিত্যিকের কাজই হল পুরোটা expose করা, innate গণ্ডগোল, লুকিয়ে থাকা সত্যের অবয়বটাকে সদৃশ করে তোলা। আর সবটাই আমি করি একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আমি আপামরই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ রাজনীতি কোনও দিনই ছিল না, নেই; অথচ সেই আমি ‘মানুষটা’ই রাজনীতি বাদ দিয়ে বড় অনুন্নত। আর লেখাটা আমার politics-এর extension, এমনকী আমার অস্তিত্বের প্রকাশও বটে। সমাজের প্রতি আমার অনুভূতি, তথাকথিত প্রচলিত মধ্যবিত্ত সমাজের থেকে একদমই বিরূপ। তাকে গ্রহণ না করেই আমি লিখছি, লিখব। শুধু লেখার বিষয়বস্তু নয়; তার গঠন, শৈলী, ভাষা, লেখার আদর্শ পুরোটাতেই তার ছাপ ফেলে যায়। আর বাঙালী সমাজ একটা এলিয়েনেশন-এর শিকার। আজ কালচারাল স্টল ওয়ার্ট বলতে একটা refined mediocrity-কে বোঝায়। পুরোটা এতোটাই সাংঘাতিক পর্যায়ে গেছে যে বাঙালি নতুন করে ভাবতে পারছে না। কেন বা তার কারণ বিশ্লেষণী ক্ষমতা অবশ্য আমার সহজাত নয়। বাঙালী খুব স্থিতাবস্থা ভালোবাসে। ত্রিশোর্ধ বছরের স্থিতাবস্থা মানুষ ভাঙলেও পুরো কর্মকাণ্ডের ফল কিন্তু ‘পুনঃ মুষিক ভব’। পঁয়ত্রিশ বছরের এই অচলায়তন ভেঙে কী হল সেটাও অবশ্য যথেষ্ট চিন্তাযোগ্য। বিনায়ক সেন ছাড়া পাওয়ার পর একটি সভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গবাসীও সদ্য কারাগারের লৌহ কপাটকে তুচ্ছ করেছে। তবে সেই মুক্তির সাময়িকতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ ছিল আমার আর সেই সন্দেহকে সত্যি প্রমাণিত করেই সেই সাময়িক স্থিতাবস্থার প্রত্যাবর্তন— ফলাফল আমরা গাড্ডায়! অবশ্য এগুলোকে আমি খুব একটা পাত্তা দিই না। ইতিহাসে অনেক কিছু ঘটে আবার ধুয়ে মুছে যায়। খুব বেশি পাত্তা এদের যেমন প্রাপ্য নয় আর ওদের ফ্যাসিস্ট Demagogy-র পরিণতি সুখকর নয়।

 মুখোশহীন চরিত্রের সন্ধানে (মেঘ)
‘আগুনমুখো’–র যে ছেলেটা আগুন ছুঁড়তে ছুঁড়তে ক্লান্ত হয়ে বমি করে, মিছিল তাকে ফেলে চলে যায়। তবু সে সেই মিছিলে আবার ফিরতে চায়। বস্তুত, একটা বড়ো জনযাত্রা কখনই থেমে থাকতে পারে না, যে অসুস্থ হয় তাকেই সাময়িকভাবে সরে যেতে হয়। কিন্তু তার মিছিলে ফিরে যাওয়ার প্রয়াস কিন্তু থেকেই যায়— সেটা কাম্য। তবে সে মিছিল কিন্তু মুখোশ নয়, ছোট্ট ছোট্ট ঘটনা, ফুটে ওঠা একাকী চরিত্রগুলি আমার জীবনের রাস্তা থেকেই কুড়ানো নুড়ি। যা কিছু ঘটে তার অংশগ্রহণেই লেখাগুলোকে খুঁজি, লেখার ধান্দা নিয়ে আমি reality-তে যাই না, কারণ এ reality-ই আমাকে সব কিছু দিয়েছে। আর তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়াসই হল আমার লেখা। ফ্যাতাড়ুরা কোনও সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফসল নয়। অবচেতন মনের কোণে তাদের জন্ম, আবার অবসরের চিন্তায় তাদের শৈশব, কৈশোর আমি কখনও না লিখলেও, মাথার মধ্যে চরিত্রগুলো থাবা বসায়। এভাবেই চিন্তাগুলো সঠিক সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের পরিপূর্ণ করে তোলে।

 সাদা মুখোশ (মেঘ)
মুখোশ সম্বন্ধে বলতে পারি, পুরো ব্যাপারটাই হল প্রয়োজনীয়তা, অর্থাৎ কী কারণে মুখোশটা পরবে? একজন ক্রান্তিকারী পরবে মুখোশ, তার মুখোশটাই তখন অবস্থার কথা বলবে, সেই উদ্দেশ্য কিন্তু স্বাগত। এই মুখোশই আবার হতে পারে মুখের পরিবর্ত। এক মানুষের হাজার সত্তা তো থাকতেই পারে। যেমন লেখক পরিচিতি নিয়ে আমি রাস্তায় বেরোতে পারিনা, আমার চরিত্রগুলো খুঁজে পাওয়ার তাগিদটা তখন বড় হয়ে ওঠে বলে। নানাভাবে নানাস্থানে মিশতে হয় বলেই কিন্তু আমার হাজারটা মুখোশ নেই। আমি সচেতনতাকে সঙ্গী বাছলে মুখোশ তখন অবাঞ্ছিত। ক্ষতিকর মুখোশ ভাঙায় আমি বিশ্বাসী আর নিরামিষ মুখোশ অনেকাংশেই মিশে যায় মুখের সঙ্গে— সে মিশে যাক। যেমন বলতে পারি সন্তানের সামনে রাশভারি সাজা কিন্তু নিন্দনীয় মুখোশের বিজ্ঞাপন নয়। মুখোশের মোদ্দা কথাটাই হল প্রয়োজন পূরণে তার আগমন হলেও পরবর্তী ক্ষেত্রে তার ঔচিত্য হল প্রকৃতপক্ষে নান্দনিক অনুভূতির প্রকাশ মাত্র। ইতালিতে একটি প্রেমের উৎসবই হয় মাস্ক নিয়ে— ভেনেসিয়ান মাস্ক— হয় মেক্সিকোতেও। এগুলোর প্রত্যেকটাই একটা সামাজিক বার্তা বহন করে।

 কালো মুখোশ (মেঘ)
মধ্যবিত্ত সমাজ এক অদ্ভুত hypocrisy-তে আক্রান্ত। যে যা নয় তা দেখাতে— আর যা সে নিজে তা দেখতে চায় না। এই hypocrisy-র জালে সে ছটফট করে। এর আদর্শ উদাহরণ যে বাঙালি বুদ্ধিজীবী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মুখে বসে গেছে শঠতা, আড়ালে রাখতে চাওয়া মুখোশগুলো— That has got to be combated। রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী ও মিথ্যাচারের মুখোশ কিন্তু ভয়ঙ্কর। অথবা উন্নততর মানবিকতা ‘দেখানোর’ প্রয়াসের অন্তরালে গর্জে ওঠা কালোবাজারি ব্যক্তিত্বই প্রকৃত মুখোশ। যা কিছু দৃশ্যমান, যেমন ভারতীয় গণতন্ত্র এক বৃহৎ মুখোশ। ‘দেশ’, ‘হাসপাতাল’ উদ্দেশ্য বিচ্যুত আজ, তারাও মুখোশ। সত্তরের আন্দোলন ছিল এমনই এক মুখোশ ভাঙার খেলা, যা কিন্তু বাহ্যিক ভাবে ব্যর্থ হলেও প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থ নয়।  যে কোনও আন্দোলন কালের নিয়মে নিঃশব্দ হয়, গভীরে চলে যায়, আর্টের্জিয় জলের মতো ফিরে আসে আবার। আমি অপরাজেয় সংগ্রামে বিশ্বাসী। তারই প্রেক্ষিতে বলতে পারি কোনও আন্দোলনই ব্যর্থ হয় না। সত্তরের আন্দোলনের সাফল্য এটাই যে সেই সময় সমগ্র রাজ্যের নজর এনে দিল কৃষক ও তাদের জমির ওপর। প্রথম বামফ্রন্ট সরকার দিল গরিব চাষিকে জমির পাট্টা। ভাগচাষী, খেত-শ্রমিকরা পেল আইনি জমির মালিকানার স্বাদ। তবে মুখ পাল্টায়, নাহলে কমিউনিস্টদের মধ্যে ফুটে উঠলো কংগ্রেসি কালচার! তবে বাঙালিরও কিছু চারিত্রিক দোষ ছিলো, যার মধ্যে একটি হল বাবু কালচার। যার দ্বারা প্রভাবিত ওই ধূতি-পাঞ্জাবি পরা মুখ্যমন্ত্রীগণ যাদের কার্যকলাপ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার নজির মিলল সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে। আর তার সুযোগ নিয়ে যারা ক্ষমতায় এল তারা আরও বেশি খারাপ। যেমন আমি মনে করি, আজকে যদি ওই বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে সে আগের রূপ কখনোই ধারণ করতে পারে না। ইতিহাস সহবত শেখায়, চাগায়।

 মুখোশ সমাজে গরিবেরা (মেঘ)
এই প্রসঙ্গে বলি, জীবনের বেশিরভাগটাই ট্র্যাজিক। আনন্দের মুহুর্ত জীবনে হাতে গোনা, ট্র্যাজেডিটাকেই ধারাবাহিকভাবে বহন করে যেতে হয়। আর গরিব মানুষ তো দুঃখের সলিলেই সমাধিস্থ থাকে। অবশ্য তারা সেটাকে পাত্তা দেয় না, আর পাত্তা দিলেও তো তাদের জীবন সমস্যামুক্ত হবে না। দৈনন্দিন প্রাত্যহিক বঞ্চনা স্বীকার করে যে ছেলেটা জিন্‌স পরে রিকশা চালায় সে তার জিন্সের ব্র্যান্ড না থাকা সত্বেও কিন্তু খুশি। তাদের কথা বলতেই আবির্ভাব ফ্যাতাড়ুদের, যারা প্রকৃতপক্ষে অজ্ঞাত পরিচয় জনমিছিল, তারা শ্রমজীবি হতে পারে বা কৃষক। তাদের এই মুখোশহীন সংগ্রাম কিন্তু চলবেই। তবে যে গরিব সিপিএম বিনা কারণে প্রাণ হারাচ্ছে মাওবাদীদের হাতে, তাদের কোন দোষ নেই। তারা তো মাওবাদীদের শ্রেণীশত্রুও নয়। তারা কী? শুধুমাত্র বঞ্চনার শিকার, যা তাদের ললাটে লিখন হয়েছে বুর্জোয়া politics-এর দেশে।

 (মেঘ) মুখোশের জন্ম, মুখোশের পরিবার— 
সাধারণ মানুষের শৈশবেই তাকে মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হয়। সে তার অভিভাবককে মিথ্যাচারী হতে না দেখলে, সে কখনোই মিথ্যা বলবে না। পরোপকারী অভিভাবকের সন্তান কখোনই গড়ে তোলে না স্বার্থমুখর খাদক সমাজ। ভোগবাদ এ সমাজের এক বড়ো কলঙ্ক। ভোগের পিছনে দৌড়ানো ছেলেটি কখন যে নিজেই হয়ে ওঠে ভুক্ত, সে বুঝতেও পারেনা। Consumer world-এর এটাই মূল উপজীব্য যে সেই সংস্কৃতিকে সে খাদ্য হিসাবে বেছে নেয়। Consumer world-এর মুখোশের গভীরতা অনেক বেশি। তা কামড়ে বসে এই সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি অঙ্গে।

 Masked Media, Masked Literature (মেঘ)
কয়েক বছর আগে ভারত, কিউবা সহ কয়েকটি দেশ মিলে Non-align news pool তৈরী করেছিল। যার প্রতিকী উদ্দেশ্যই হল, ক্যালিফোর্নিয়ার একটি Night club-এ চারজন Bar-girl-এর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার থেকে কোনও বন্যায় মৃত চল্লিশ হাজারের খবরের তাৎপর্য বা ওজন অনেক বেশি। মিথ্যারূপ তুলে ধরে নিজ স্বার্থ্যাচারণকারী গণমাধ্যমই তো আসলে মুখোশ। Political calculation করে যারা কাউকে ফেলে, কাউকে তোলে, হাওয়া তৈরী করে, শ্বাসরূদ্ধও করে। আর এই অসংখ্য মুখোশের দাবিতে, আক্রমণে মানুষ আজ ঘুরপাক খাচ্ছে, টেলিভিশন শো-তে বসা কয়েকটা নির্দিষ্ট ‘কুমিরের ছানা’ নির্দিষ্ট ওপিনিয়ন তৈরী করছে। এরা কারা? কেন আমি এদের কথা শুনব? আমার তো নিজস্ব মস্তিষ্ক আছে, আমি নিজে বিচার করব। অথচ মানুষ শুনছেও এইসব পূর্বনির্ধারিত কর্মকাণ্ড।
মুখোশের সাহিত্যও খুব শক্তিশালী, তবে আমি সেগুলো পড়িনা, এগুলো just nonsense। যারা তাদের লেখার সম্ভার নিয়ে আসছে তাদের অনেকেই কিন্তু মুখোশহীন, ইদানীং দেখছি market-টাই প্রধান; যদিও বিভুতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়র কাছে ছিল সাহিত্যি তপস্যা, আর যদি মানুষ সেই nonsense লেখা পড়ে, পড়ুক; আমি তাদের সর্বদা গুরুত্ব দিয়ে চলার মানুষও নই। ওদের প্রতি আমার কোনও বিশেষ দায় না রেখেই বলছি আমি নিজ মর্জির মালিক।

গান্ধী, বুদ্ধ ও ইতিহাস (মেঘ)
ধর্মপ্রবর্তকদের মুখোশ নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। মতান্তরে, গান্ধীজিরও নাকি মুখোশ ছিল। তবে তাদের মুখোশহীন কার্যকলাপই আমায় আকৃষ্ট করে। They are great human symbols। তাদের ইতিহাস থেকে অনেক কিছুই শিক্ষণীয়। আর ইতিহাস— সে বড়ো নির্মম; কালের নিয়মে সে ছুড়ে ফেলে দেয় অপ্রকৃতদের। আর সেই ইতিহাসই আমার বড় প্রিয়।

 আটষট্টির ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সৈনিক হয়ে বলতে পারি যে আমি সেই ইতিহাসের ঘ্রাণ নিয়েই বেঁচে আছি। এ ইতিহাস আমায় বড়ই ভাবায়, আবার এ ইতিহাসই শতশত মুখোশের অন্তিম চিতার আগুন, সে আগুনের সাক্ষী।

আদর্শ সমাজ ও মুখোশ (মেঘ)
আমরা সবাই আদর্শ সমাজকে ছুঁতে চাই। যদিও তার বাস্তবতা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। মানুষ আদর্শ সমাজ গড়তে কিঞ্চিৎ হলেও অসফল হবে।ও আশাবাদী যে সমাজ হবে মুখোশহীন আর সেই অভিযান নিয়েই আবার ফিরে আসবে ফ্যাতাড়ুরা, উড়ে বেড়াবে মুখশহীন সমাজের বুকে। আর এবার তারা প্রবেশ করবে high thinking world দিয়েই।
অপেক্ষায় থাকুন।

 
                                                 -----------নবারুণ ভট্টাচার্য,,(বৃষ্টি),,,,

** ঐহিক সাহিত্য পত্রিকার ২০১৩ বইমেলা সংখ্যা “মুখ ও মুখোশ”-এ ‘কথনের আয়না’ বিভাগে প্রকাশিত। অনুলিখন: শৌনক চ্যাটার্জী।
*নবারুণ-ভট্টাচার্য* *মুখোশ* *সমাজ* *সমাজ-ব্যবস্থা* *সাহিত্য* *ফ্যাতাড়ু* *নবারুণ*

বিম্ববতী: "মধ্যবিত্ত সমাজ এক অদ্ভুত hypocrisy-তে আক্রান্ত। যে যা নয় তা দেখাতে— আর যা সে নিজে তা দেখতে চায় না। এই hypocrisy-র জালে সে ছটফট করে। এর আদর্শ উদাহরণ যে বাঙালি বুদ্ধিজীবী তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাদের মুখে বসে গেছে শঠতা, আড়ালে রাখতে চাওয়া মুখোশগুলো— That has got to be combated।"(মেঘ)

*নবারুণ-ভট্টাচার্য* *মুখোশ* *মধ্যবিত্ত* *বই* *সাহিত্য* *নবারুণ*

বেশতো সাইট টিতে কোনো কন্টেন্ট-এর জন্য বেশতো কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।

কনটেন্ট -এর পুরো দায় যে ব্যক্তি কন্টেন্ট লিখেছে তার।

...বিস্তারিত

QA

★ ঘুরে আসুন প্রশ্নোত্তরের দুনিয়ায় ★