বেশতো সাইট টিতে কোনো কন্টেন্ট-এর জন্য বেশতো কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। কনটেন্ট -এর পুরো দায় যে ব্যক্তি কন্টেন্ট লিখেছে তার।

 

খলিফা আনিস বিন সাঈদ মহলের বারান্দায় উদাস হয়ে বসে আছেন।

আঙুরের শরবত হাতে নিয়ে খলিফার বেগম কয়েক দফা ঘুরে এলেন। খলিফা ফিরেও তাকালেন না। উজির আসল কিছু বিচার আচারের কাহিনী নিয়ে। খলিফা আগ্রহী হলেন না। কোনোকিছুতেই তার এখন কোনো মন নেই।

তিনি একমনে ভাবছেন প্রজাদের কথা, তার সাম্রাজ্য ঢাকার মানুষদের কথা।

কেমন আছে ঢাকার মানুষ? তারা কি আসলেই সুখে আছে! খলিফা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।

এক সময় এই দেশের ছিল সোনালী এক যুগ। সে সময় মানুষের গোলা ভরা ধান ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল। প্রজারাও রাজার হালে দিন কাটাত! ইন্সটাগ্রামে মানুষ হ্যাশট্যাগ ফ্রেশ লিখে ছবি দিত পুকুরের তাজা মাছের, সবুজ ধানক্ষেতের! কোথায় হারিয়েছে সেসব দিন! এখন মানুষ ইন্সটাগ্রামে তাই পায়র জুতাজোড়া বাদে আর কিছুর ছবি দেয় না। টেলিকম কোম্পানি বাংলালিংকের এডে পর্যন্ত চলে এসেছে সেই কথা, 'সেই দিন কি আর আছে, দিন বদলাইছে না?'

খলিফা অকারণেই ফেসবুকের হোমপেজ স্ক্রল করতে লাগলেন। এক ফাঁকে ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে একটা স্ট্যাটাসও দিতে গেলেন একবার, 'মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা...' পরে থামলেন। তিনি খলিফা মানুষ, এইসব লুতুপুতু পোস্ট দেয়া তাকে মানায় না।

খলিফা উজিরকে দ্রুত ডেকে পাঠালেন।

-জ্বি, জাহাপনা।

-আচ্ছা, ছদ্মবেশ ধারণ করার কী উপায় আছে বলুন তো?

-আপনি? ছদ্মবেশ নিবেন? আপনি কি কোথাও অভিনয় করছেন জাঁহাপনা! মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ!

জাঁহাপনা বিশেষ বিরক্ত হলেন। এই ছাগলটাকে উজির বানানো বিরাট ভুল হয়েছে। ওর মতামতের ওপর ভরসা করা উচিত না। তবু খলিফা আবারও প্রশ্ন করলেন, 'ফাজলামি মার্কা কথা বলবা না। আমি গণমানুষের মধ্যে মিশতে চাই। তাদের অবস্থা দেখতে চাই। সিরিয়াসলি বলো, ছদ্মবেশ ধারণের সিস্টেম কী কী আছে? কী করা যেতে পারে?'

-জাঁহাপনা, আপনি নরমালিই বের হন। ফেসবুকে যারা আপনার এডিট করা ছবি দেখে অভ্যস্ত, কেউ নরমাল লুকে চিনতে পারবে না।

উজির কষ্টে হাসি চাপা দিয়ে রাখল। তাতে অবশ্য খলিফার বিরক্তি ঠেকানো গেল না। খলিফা উজিরকে চলে যেতে বললেন। উজির শুধু একবার বলে গেলেন, 'জাঁহাপনা, আপনি যখন বের হবেন, ছদ্মবেশে কেন! হাতির পিঠে চেপে রাজ্য ঘুরে আসুন। বিরাট দল নিয়ে বের হয়ে যাই।'

খলিফা তীব্র আপত্তি করলেন, 'অবশ্যই না। অকারণেই রাস্তায় ভিআইপি মুভমেন্টের কারণে জ্যাম হোক, আমি চাই না। সাধারণ মানুষের বেশ দেখতে চাই, তারা আসলেই কেমন আছে! আপনি যান, আমিই দেখছি!'

উজির যাওয়ার পরেই খলিফা আনিস বিন সাঈদের মাথায় দারুণ এক আইডিয়া আসলো। টি-শার্ট জিন্স সানগ্লাস পরে বেরিয়ে গেলেই তো হয়। সবাই তাকে জাঁহাপনার পোশাকে দেখে অভ্যস্ত। এই ক্যাজুয়াল লুকে কেউ চিনতে পারবে না।

যা ভাবা তাই কাজ। খলিফা পুরাপুরি ক্যাজুয়াল লুকের ছদ্মবেশ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখতে তিনি উঠে পড়লেন এক লেগুনায়।

লেগুনা যাচ্ছিল মহাখালী। তিনি সেখানেই নামলেন।

মহাখালী নামতেই তিনি দেখলেন, রাস্তা এখানে ওখানে কাটা। রাস্তা বলা যায় না, মনে হচ্ছে শহরজুড়ে শুধু খাদ। এজন্যই লেগুনায় প্রচন্ড ঝাঁকি হচ্ছিল, বুঝে নিলেন তিনি। রাস্তাঘাটের এ অবস্থা? মানুষ কি তাহলে খুব খারাপ আছে? তিনি সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না। আরও দেখা যাক।

সামনে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের দিকে এগোতেই তিনি দেখলেন, মানুষ ভিড়ভাট্টার মধ্যে খুব কষ্ট করে বাসে উঠছে। কেউ ঝুলে যাচ্ছে, কেউ উঠতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে। বাসগুলোও কিছু দরজা লক করে যাচ্ছে, কিছু মানুষ এমনভাবে তুলেই যাচ্ছে যেন বাস না, সেটা লঞ্চ! খলিফা আবারও চিন্তায় পড়লেন। মানুষ কি তবে দুর্দশাতেই আছে খুব? এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় বুঝি ঠিক হবে না। খলিফা সামনে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। আরও দেখা যাক।

আরেকটু সামনে এগোতেই তিনি দেখলেন, সামনে লেক। কোনো রাস্তা নেই। লেক পার হতে তিনি নৌকায় উঠলেন। নৌকার অন্যান্য যাত্রীদের আলাপচারিতা থেকে তিনি বুঝলেন, লেক না, এটাই আসলে রাস্তা। দুদিন আগে হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে সেই যে কোমরা পানি উঠলো, এখনো নামে নি! খলিফার কপালে দুশ্চিন্তার রেখা আরও একটা বাড়লো! তবে কী... রাজ্যে প্রজারা এতটাই কষ্টে কাটাচ্ছে দিন! খলিফার মন কেঁদে উঠতে চাইলো, কিন্তু তিনি বেগমের সঙ্গে কিছুক্ষণ চ্যাট করে ইমোশন কন্ট্রোল করলেন!

নৌকা থেকে নামতেই, খলিফা দেখলেন একটা জায়গা ঘিরে মানুষের খুব জটলা। অনেক মানুষ আগ্রহ করে কী যেন দেখছে। সেখানে কিছু পুলিশও দাঁড়ানো, তারা কী কী যেন সিলসাপ্পড় মারছে, ছবি তুলছে, নোট নিচ্ছে। খলিফা এগিয়ে গেলেন। গিয়ে দাঁড়ালেন সাংবাদিকের ক্যামেরার পাশে। টিভি সাংবাদিক প্রতিবেদন বানাচ্ছিলেন তখন, তার কথা থেকে ঘটনা বুঝতে পারলেন খলিফা। কিন্তু, যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না!

যেটা ঘিরে এত মানুষের জটলা, সেটা একটা মার্সিডিজ গাড়ি। দেশেরও নয়, অন্য দেশের রাজারা এসে যেই গাড়িতে চড়ে, রাজসভার বিশেষ অতিথিদের জন্য যেই গাড়ির চল রয়েছে, সেই মার্সিডিজ গাড়ি। কে যেন এই গাড়ি রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে। নাম ধাম কিছুই লেখা নেই, কিচ্ছু না। যেন কদিন ব্যবহার করে ভালো লাগে নি, ফেলে রেখে চলে গেছে, কারো দরকার হলে না হয় নিয়ে যাবে!

 

খলিফা বিস্মিত হলেন! রাজ্যের মানুষ এত স্বচ্ছল, তাদের এত টাকা! কী দারুণ ব্যাপার! এত টাকা মূল্যের যে রাজকীয় গাড়ি, সেটাও রাস্তায় দান করে রেখে গেছে! টিভি রিপোর্টারের রিপোর্ট পড়া থেকে তিনি আরও শুনলেন, গত এক সপ্তাহে দেশে এ রকম কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এখানে ওখানে পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে মার্সিডিজ গাড়ি!

খলিফার চোখে আবেগে পানি চলে এলো! দেশের মানুষ যেন পঙ্খিরাজ এখানে ওখানে দান করে রেখে চলে যাচ্ছে। এত ধন সম্পদ তাদের, তাঁর চেয়েও বড় তাদের মন! খলিফা নিজের ওপর খুশি হলেন, ভাগ্যিস ওসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখে কোনো সিদ্ধান্তে আসেন নি! দেশের মানুষ নিশ্চয়ই বড় ভালো আছে... রাজার হালে কাটছে তাদের দিন! গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ না থাকতে পারে, আমাদের রাস্তা ভরে যাচ্ছে দান করা মার্সিডিজে! এই সুদিনের অপেক্ষাতেই তো তিনি ছিলেন!

খলিফা উজিরের ফোন বন্ধ পেয়ে মেসেঞ্জারে তাকে টেক্সট করলেন, 'উজির, দ্রুত আমার পনেরোটা মার্সিডিজের কোনো একটা শহরের কোথাও ফেলে রেখে আসো তো! মানুষের সঙ্গে এই মার্সিডিজ দানের উৎসবে খলিফা হয়েও আমি একাত্ম হতে চাই...'! মেসেজ সিন হলো কিনা খলিফা তা খেয়াল করেন নি... আবেগে তাঁর দু চোখ যে ঝাপসা হয়ে এসেছে ততক্ষণে! আজ তিনি সফল, সত্যিকারের সফল!....

.................................................................সংগ্রহ